ভালোবাসার গল্প

শনিবার, ২ মে, ২০২০

টেকনাফে পাতা খাচ্ছে নতুন পোকা, ঘাস ফড়িং না পঙ্গপাল?



টেকনাফে পাতা খাচ্ছে নতুন পোকা, ঘাস ফড়িং না পঙ্গপাল?




নতুন প্রজাতির ফড়িং গোত্রের একটি পোকার সন্ধান পাওয়া গেছে কক্সবাজারের টেকনাফে। এই পোকা বিভিন্ন গাছের পাতা বেশ দ্রুতগতিতে খেয়ে ফেলছে। ভারত ও পাকিস্তানে পঙ্গপালের উপস্থিতিতে তাই শঙ্কা তৈরি হয়, টেকনাফে হাজির হওয়া এই পোকও পঙ্গপাল কি না। দুয়েকএকজন কীটতত্ত্ববিদও একে পঙ্গপালের কোনো একটি গোত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টরা প্রথমিকভাবে এই পোকাটিকে ঘাস ফড়িংয়ের নতুন কোনো প্রজাতি বলে মনে করছেন।

এরই মধ্যে পোকাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে অধিদফতর। বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদের টিমও পাঠানো হচ্ছে আক্রান্ত স্থানে। পোকাটির ভিডিও ও ছবি পাঠানো হয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সদর দফতরেও।
জানা গেছে, সম্প্রতি টেকনাফের লম্বরি নামক স্থানের একটি বাড়িতে ঝোঁপের মধ্যে নতুন এই পোকাটি দেখা গেছে। পোকাটি গাছের পাতা খেয়ে ফেলছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভাষ্য, একটি বাড়ি বাদে পোকাটি ওই এলাকার অন্য কোনো স্থানেও দেখা যায়নি।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও দেখা গেছে, যেখানে একজন ব্যক্তি তার বাড়িতে নতুন এক ধরনের পোকার আক্রমণের কথা জানাচ্ছেন। লাইভ ভিডিওতে দেখা যায়, গাছের পাতা খেয়ে ফেলছিল পোকাগুলো।

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কক্সবাজারের উপপরিচালক মো. আবুল কাশেম সারাবাংলাকে বলেন, ‘টেকনাফে নতুন একটি পোকার সন্ধান পাওয়া গেছে। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) আমরা স্পটে গিয়েছি। সেখানে দুই-তিন বছর আগে একজনের একটি পোলট্রি ফার্ম ছিল। সেখানে ঝোপ-ঝাড়ে জংলি গাছ আছে। সেখানে এক ধরনের পোকার আক্রমণ দেখা গেছে। ছোট ঘাস ফড়িংয়ের চেয়েও ছোট, গোল্ডেন কালারের দাগ আছে, পাখা নেই, পাতা খায়— এমন এক ধরনের কীট।
তিনি বলেন, আমাদের উপসহকারী কর্মকর্তা সেখানে কীটনাশক স্প্রে করেছেন, পোকাগুলো মরে গেছে। কিন্তু তার মধ্যেই দুয়েকটি পোকা লুকিয়ে ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পোকাগুলো পাচ্ছিলাম না। পোকাগুলো দল বেঁধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, দল বেঁধে পাতা খায়। অনেক খোঁজাখুজির পর জঙ্গলের ভেতর (অনেকটা বনের মতো) থেকে একটি ঢালে কিছু পোকা পেয়েছি। সেগুলো অনেক চেষ্টা করে পলিথিনে প্যাকিং করেছি। অর্থাৎ পোকাগুলো স্যাম্পল সংগ্রহ করেছি। সেখানে আমরা ভিডিও-ও করেছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ওই নমুনা ও ভিডিও পাঠানো হয় গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি)। নমুনা ও ভিডিও দেখে অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, এটি মরুভূমির পঙ্গপালের কোনো একটি প্রজাতি হতে পারে। আর বারি’র কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. দেবাশীষ সরকার জানান, এটি ফড়িং গোত্রের কোনো একটি প্রজাতি হতে পারে। নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন দুই গবেষক।
জানতে চাইলে ড. দেবাশীষ সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই পোকাকে পঙ্গপাল বলছেন কেন? আমরা কক্সবাজারে দু’জন সিনিয়র বিজ্ঞানীকে পাঠাচ্ছি। কক্সবাজারের কর্মকর্তা (উপপরিচালক আবুল কাশেম) আমাকে ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছেন। তার সঙ্গে বিস্তারিত কথা হয়েছে। আমার কাছে এটিকে পঙ্গপাল মনে হয়নি। এটি ঘাস ফড়িংয়ের প্রজাতি হতে পারে।

বারি’র এই বিজ্ঞানী বলেন, এই পোকা শুধু বনে পাওয়া গেছে। কোনো ফসলে নয়। পঙ্গপাল ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে। উপপরিচালক জানিয়েছেন, এর কোনো পাখা নেই। আর আক্রান্ত জায়গা থেকে সীমান্তওও অনেক দূরে। আপাতদৃষ্টিতে পঙ্গপালের কোনো বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে দেখা যায়নি। ওখান থেকে আমাদের বিজ্ঞানীরা সরেজমিন দেখে আসার পর রিপোর্ট করলে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করলে তারপর আমরা বলতে পারব পোকাটি কোন প্রজাতির।
কৃষি সচিব নাসিরুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘একজন কীটতত্ত্ববিদ একে লোকাস্ট বা পঙ্গপাল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এটি সেরকম পঙ্গপাল নয়, এটি ঘাস ফড়িংয়ের একটি জাত। সেখানে একটি বাড়িতেই এটি দেখা গেছে। ভিডিও দেখে ওই কীটতত্ত্ববিদ এটি বলেছেন। কিন্তু ভিডিও দেখে একটি কীটকে চেনা এত সহজ নয়। তারপরও আমরা সেখানে কীটতত্ত্ববিদদের পাঠাচ্ছি। এফএও’তে আমরা ভিডিও ও ছবি পাঠিয়েছি। তারাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। ফল এখনো জানায়নি। তবে সব জেনেশুনে ও তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা বলছি, এটি পঙ্গপাল নয়। কারণ পঙ্গপালের সব বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে নেই।’

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখার পরিচালক ছাব্বির বিন জাহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশের কোথাও পঙ্গপাল হানা দিয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য নেই।’
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সহকারী রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. নূর আহমেদ খন্দকার শুক্রবার (১ মে) বিকেলে সারাবাংলাকে বলেন, মাঠে যারা আছেন, তারা একটি ভিডিও করেছেন ও ছবি সংগ্রহ করেছেন। আমরা তা হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়েছি। এফএও টেকনাফে কোনো প্রতনিধি পাঠাবে না। কারণ বাংলাদেশে মরুভূমির পঙ্গপাল আসেনি, আসবেও না। যেসব দেশে বছরে ২০০ মিলিলিটারের কম বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে পঙ্গপাল বেঁচে থাকতে পারে। বাংলাদেশে বছরে ১০০০ থেকে ১২০০ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়। তাই এখানে মরুভূমির পঙ্গপাল আসার কোনো শঙ্কাই নেই।
তিনি বলেন, টেকনাফে যে পোকা পাওয়া গেছে, কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলছেন এটি ব্যাম্বু লোকাস্ট, কেউ বলছেন কফি লোকাস্ট। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন কফি লোকাস্টের পক্ষে। তাই শষ্যখেকো পঙ্গপাল ধেয়ে আসছে— এটা বলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি না করাই উত্তম।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, টেকনাফে যে কীট পাওয়া গেছে, তা পঙ্গপাল নয়। পঙ্গপাল যে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, ঘাস ফড়িংও একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ঘাস ফড়িংয়ের ৫ হাজারের চেয়ে বেশি প্রজাতি আছে। এর মধ্যে ৯টি প্রজাতি লোকাস্ট বা পঙ্গপাল। পঙ্গপালগুলো একসঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে রাক্ষুসে স্বভাবের হয়। আবার সব সময় দলবদ্ধ থাকে না। খাবারের সংকট দেখা দিলে একা চলে।
তিনি বলেন, মরুভূমির সঙ্গে পঙ্গপালের সম্পর্ক আছে। শীতকালে যেখানে বৃষ্টিপাত হয়, সেখানেই ওরা বেশি জন্ম নেয়। পঙ্গপাল বালিতে ডিম পাড়ে, বৃষ্টি পড়লে বাচ্চা জন্ম নেয়। পঙ্গপাল একসঙ্গে লাখ লাখ দল বেঁধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়।  টেকনাফে কিছু কীট দেখা গেছে। পাহাড়ি এলাকায় এমন কীটের ক্লাস্টার দেখা যেতে পারে। সব মিলিয়ে যা দেখা গেছে, তা ঘাস ফড়িংয়ের একটি প্রজাতি বলেই মনে হচ্ছে।
এদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয় শুক্রবার (১ মে) তাদের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, টেকনাফে পাওয়া পোকাগুলো তেমন ক্ষতিকর নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব পোকা মরুভূমির ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসা পঙ্গপাল জাতীয় পোকা নয়। এ বিষয়ে আতঙ্কিত না হতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি দল টেকনাফের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) থেকেও পৃথক পৃথক টিম রওনা দিয়েছে। ঘাসফড়িংয়ের মতো দেখতে লোকাস্ট গোত্রের স্থানীয় এই পোকার শনাক্তকরণসহ আক্রমণ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংসে এই টিম কাজ করবে।

পঙ্গপাল কী?

পঙ্গপাল ঘাস ফড়িংয়ের একটি প্রজাতি। ঘাস ফড়িং একা থাকতে পছন্দ করলেও পঙ্গপাল দল বেঁধে উড়ে চলে। সাধারণত একেক ঝাঁকে কয়েক লাখ থেকে এক হাজার কোটি পতঙ্গও থাকতে পারে।  একটি পূর্ণ বয়স্ক পঙ্গপাল প্রতিদিন তার ওজনের সমপরিমাণ খাদ্য খেতে পারে। যে অঞ্চলে তারা আক্রমণ করে, সেখানে খাদ্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা অন্য অঞ্চলে যায় না।
সম্প্রতি অফ্রিকার কয়েকটি দেশের পর পাকিস্তান ও ভারতেও পঙ্গপালের আক্রমণ দেখা দেয়। আর চলতি বছরের প্রথম দিকে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) পঙ্গপাল নিয়ে একটি সতর্কতামূলক মানচিত্র প্রকাশ করে। সেখানে সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া ছাড়াও সুদান, কেনিয়া, সৌদি আরব, ইরান ও ওমানকে পঙ্গপাল আক্রান্ত দেশ হিসাবে দেখানো হয়। পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে এর তীব্র আক্রমণের চিত্র দেখানো হয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও পঙ্গপালের আক্রমণ হতে পারে— এমন আশঙ্কার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে। তবে এফএও, কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ পঙ্গপালের আক্রমণের ঝুঁকিতে নেই।

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন